আ’লীগ নেতাকে হত্যার পর গৃহকর্মী নিজের পায়ে নিজেই আঘাত করে

দুই দিনের মাথায় সাতকানিয়া উপজেলার কেঁওচিয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল হক মিয়া (৮৮) হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ।

সোমবার রাত ১০টার দিকে বেতন বাড়ানো নিয়ে নিহত সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল হক মিয়ার সঙ্গে কথাকাটাকাটি হয় গৃহকর্মী জমির উদ্দীনের (২৮)।

আর এতে ক্ষুব্ধ হয়ে রাতভর হত্যার পরিকল্পনা আঁটতে থাকেন তিনি।

ভোর ৪টার দিকে ঘুমন্ত অবস্থায় কোরাবারি (পেরেক তুলতে তৈরি স্থানীয় যন্ত্র) দিয়ে সজোরে আঘাত করে হত্যা করা হয় আব্দুল হক মিয়াকে।

এরপর ঘটনা থেকে নিজেকে আড়াল করতে ডাকাতির ঘটনা সাজাতে বাড়ির মালামাল তছনছ করে ছুরি দিয়ে নিজের পায়ে নিজে আঘাত করে।

পরে নিহত সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল হক মিয়ার ব্যবহৃত একটি এবং জমিরের দুটি মিলিয়ে মোট তিনটি মোবাইল ফোন বাড়ির পেছনের পুকুরে ফেলে দিয়ে ঘরে ফিরে এসে কাপড় দিয়ে নিজেই নিজের পা, চোখ বেঁধে খাটের নিচে একপাশে শুয়ে থাকেন ওই গৃহকর্মী।

সাতকানিয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. জাকারিয়া রহমান জিতু ও থানার ওসি মো. আনোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে পুলিশের তিনটি তদন্ত দল এ রহস্য উদঘাটন করে।

বুধবার সাতকানিয়া থানায় এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান সাতকানিয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. জাকারিয়া রহমান জিতু ও ওসি মো. আনোয়ার হোসেন।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন সাতকানিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সুজন কুমার দে, মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা শেখ মোহাম্মদ সাইফুল আলম।

ওই গৃহকর্মী জমিরের বাড়ি চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার খলিশ্যাপাড়া এলাকায়। সে ওই এলাকার হাবিবুর রহমানের ছেলে বলে জানিয়েছেন উপস্থিত পুলিশ কর্মকর্তারা।

এর আগে জমিরের দেখানো মতে গত মঙ্গলবার বিকাল থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত পুকুরের পানি সেচ করে ফেলে দেয়া হত্যার আলামত উদ্ধার করে পুলিশ।

পুলিশ জানায়, নিহত সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল হকের স্ত্রী এবং ৪ ছেলে তিন মেয়ে। তিনি বাড়িতে একা থাকতেন।

জমির উদ্দীন নামে ওই গৃহকর্মী মাসিক ৬ হাজার টাকার বিনিময়ে তার দেখাশুনা করতেন। গত ১৬-১৭ বছর ধরে ওই গৃহকর্মী কাজ করছিলেন।

এছাড়া কেঁওচিয়া ইউনিয়নের মৃত আবদুল মাবুদের মেয়ে নুরুন্নাহার (৫৫) ১৬-১৭ বছর ধরে আব্দুল হক মিয়াকে রান্না করে খাওয়ান।

নুরু মিয়া (৫৫) নামে এক রোহিঙ্গা তার বাড়ির ডেউরিতে (বারান্দায়) থাকেন। সে ক্ষেত-খামার ইত্যাদি দেখাশোনা করেন।

প্রতিদিনের মতো রোববার রাতেও রান্নার কাজে নিয়োজিত গৃহকর্মী নুরুন্নাহার চেয়ারম্যান আব্দুল হক মিয়াকে খাবার-দাবার দিয়ে বাড়িতে চলে যান।

রাত ১০টার দিকে নিহত আব্দুল হক মিয়ার সঙ্গে গৃহকর্মী জমিরের বেতন বাড়ানো প্রসঙ্গে কথাকাটাকাটি হয়।

এতে ক্ষিপ্ত হয়ে আব্দুল হক মিয়াকে হত্যার পরিকল্পনা আঁটে গৃহকর্মী জমির।

পরে ভোর আনুমানিক ভোর ৫টার দিকে কোরাবারি (পেরেক তোলার স্থানীয় যন্ত্র) দিয়ে সজোরে মাথায় আঘাত করে হত্যা করা হয় আব্দুল হক মিয়াকে।

সকালে রান্নার কাজে নিয়োজিত আরেক গৃহকর্মী কেঁওচিয়া ইউনিয়নের মৃত আবদুল মাবুদের মেয়ে নুরুন্নাহার (৫৫) সামনের দরজা খোলা না পেয়ে পেছনের দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকে দেখতে পান খাটের ওপর আব্দুল হক মিয়ার লাশ এবং অন্যপাশে চোখ-মুখ বাঁধা গৃহকর্মী জমির।

এ সময় তার চিৎকারে এগিয়ে এসে স্থানীয়রা পুলিশে খবর দেন।

খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে লাশ উদ্ধার করে গৃহকর্মী জমিরকে স্থানীয় বেসরকারি একটি হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে পুলিশি হেফাজতে নেয়।

পরে সে বিভ্রান্ত করতে পুলিশকে নানারকম তথ্য দিতে থাকে।

বিভ্রান্তিকর এসব তথ্য পেয়ে পুলিশ তাকে আরও কঠোর জিজ্ঞাসাবাদ করে। জিজ্ঞাসাবাদে আব্দুল হক মিয়াকে হত্যার বর্ণনা দেয় ওই গৃহকর্মী।

সাতকানিয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জাকারিয়া রহমান জিকু বলেন, গৃহকর্মী জমির নিজের হাত-পা বেঁধে ডাকাতির ঘটনা সাজিয়ে এ হত্যাকাণ্ড ধামাচাপা দিতে চেয়েছিল।

এছাড়া নিহতের আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে জমিজমা নিয়ে বিরোধের তথ্য দিয়ে পুলিশকেও বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছিল।

পুলিশ তাকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করে অল্প সময়ের মধ্যে হত্যার রহস্য উদঘাটন করেছে। পাশাপাশি হত্যায় ব্যবহৃত সব আলামতও উদ্ধার করেছে।

এ ঘটনায় নিহতের বড় ছেলে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। ওই মামলায় গৃহকর্মী জমির উদ্দীনকে গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে বলে তিনি জানান।

সোমবার সকাল ১০টার দিকে উপজেলার কেঁওচিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যানপাড়ার নিজ বাড়ি থেকে ওই ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল হক মিয়ার রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

সেদিন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন জেলা পুলিশ সুপার এসএম রশিদুল হক, সাতকানিয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. জাকারিয়া রহমান, ওসি মো. আনোয়ার হোসেন, উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আল বশিরুল ইসলাম।

ঘটনার দিন আব্দুল হক মিয়ার বড় ছেলে সাতকানিয়া ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতি নেজাম উদ্দীন বলেছিলেন, বাবার কাছে সবসময় টাকা-পয়সা থাকে।

কাজের লোক লোভে পড়ে এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়ে থাকতে পারে।

এদিকে বুধবার সকালে এ ঘটনায় নিহতের বড় ছেলে সাতকানিয়া ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতি নেজাম উদ্দীন বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন।

মন্তব্য এর উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন
আপনার নাম